Institution

Midnapore: ওরাই পারল, চোখে জল এনে দিল অতিথি, অভিভাবক ও শিক্ষিকাদের! মেদিনীপুরের মান রাখল পাহাড়ীপুরের মেয়েরা

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৪ মে:স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্য বহনকারী, অনুশীলন সমিতির আখড়া কেন্দ্র। ইতিহাসের হাত ধরে সেই আখড়া কেন্দ্রই এখন উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। কালজয়ী ঐতিহাসিক মে দিবসের (১ মে) দিন মেদিনীপুরের মেয়েদের জন্য এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ডঃ প্যারীলাল দত্ত, অবিনাশচন্দ্র দত্ত, বাবু উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর এবং গোবিন্দ চন্দ্র দত্ত প্রমুখরা। বাম জমানায় জুনিয়র থেকে মাধ্যমিক, তারপর ধাপে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা শহর মেদিনীপুরের এক প্রান্তে (জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন পাহাড়ীপুরে) অবস্থিত, ঐতিহ্যমন্ডিত পাহাড়ীপুর বালিকা বিদ্যালয় (উঃ মাঃ)। ২০২২-এর ১ মে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে সূচিত হয় ১২৫ তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের উদযাপন। তারপর, ২ মে ও ৩ মে দু’দিন ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ সংবর্ধনা সভা। না, কলকাতা কিংবা মুম্বাইয়ের কোনো শিল্পীরা আসেননি অনুষ্ঠান করতে। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচে অনুষ্ঠিত হয়নি নামি দামি ব্যাণ্ডের অনুষ্ঠান বা অর্কেষ্ট্রাও। বিদ্যালয়ের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নিবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের মেয়েরাই, স্কুলের সামান্য বরাদ্দ টাকায় শিক্ষিকাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়ে উপস্থাপন করে, ‘বিশ্বকবি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্য থেকে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সাম্যবাদের চিন্তাভাবনা, ভারতীয় সম্প্রীতির পরম্পরা, বিদ্যাসাগরের জেলায় নারী শিক্ষা, নারী স্বনির্ভরতার বার্তা সহ গীতি আলেখ্য, নাটক, সমবেত গান। আর, এই সকল অনুষ্ঠানেই ছাত্রীদের অনবদ্য উপস্থাপনা (বা, পারফরম্যান্স) মুগ্ধ-বিস্মিত করে অতিথিবৃন্দ সহ স্কুলের শিক্ষিকা, অভিভাবকদের। চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের শেষ দৃশ্যে আর চোখে জল ধরে রাখতে পারেন না কেউই! সমবেত করতালিতে মুখরিত হয়, জেলা শহরের প্রদ্যোৎ স্মৃতি সদন প্রেক্ষাগৃহ।

পাহাড়ীপুর বালিকা বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান :

মূলত, দরিদ্র, সাধারণ ও প্রান্তিক পরিবারের ছাত্রীদের নিয়ে যে অনুষ্ঠান তিনদিন ধরে মঞ্চস্থ হল, মনে হবে কোনো স্টুডিও বা পেশাদার মঞ্চে বহিরাগত বিখ্যাত শিল্পীরাই অনুষ্ঠান করছেন! মঞ্চে মিড-ডে মিলের সহায়িকা দিদিরা সমবেত গান গাইলেন, “আমরা কাজ করি আনন্দে।” প্রধান শিক্ষিকা রাধারানী খাড়া সহ সহকারী শিক্ষিকারা বলেন, “এই স্কুলে আমরা পড়ুয়াদের ধরে নিয়ে আসি। কম নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করার পর, যারা আর পড়তে চায়না, তাদের খুঁজে নিয়ে আসি। অথচ, এখান থেকেই ডাক্তারি পড়ছে, পুলিশে চাকরি করছে, জাতীয় কাবাডি ও ফুটবল টীমে ছাত্রীরা স্থান পেয়েছে। মাঝে মাঝে জেলা শহরের নামকরা স্কুল-কে হারিয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম স্থান দখলও করেছে। আমরা গর্বিত এমন পড়ুয়া সহ পরিবারের সাথে থেকতে পেরে।” প্রধান শিক্ষিকা রাধারানী খাঁড়া বলেন, “১৪০০’র উপর ছাত্রী। সিংহ ভাগ পড়ুয়া শহরের গরীব নিম্নবিত্ত পরিবারের। রিকসা, টোটো অটো, দোকান কর্মচারী। মায়েদের অনেকেই পরিচারিকার কাজ করেন। এমন পরিবারের ছাত্রীদের মধ্যেও যে এত প্রতিভা থাকতে পারে, তা এই অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ না হলে শহরবাসী উপলব্ধি করতে পারতেন না!” তিনি যোগ করেন, “এই স্কুলে ব্রিটিশ বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলত, অনুশীলন সমিতির কার্যকলাপ। তারপর, যুবতী, মহিলাদের দিয়ে গোপনে খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজ পরিচালনাকে বলা হত বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র। সেই কেন্দ্র পরে হয় প্রাথমিক স্কুল। আসলে সমিতির এই আখড়া কেন্দ্র ছিলো এক জঙ্গল ঘেরা ডোবার পাড়। লোকে ভাগাড় বলতো। সেখানেই আজ শতফুল বিকশিত হচ্ছে! তাও একেবারে পিছিয়ে পড়া পরিবারের অংশ থেকে। কোনো অতিরিক্ত বেতন বা ফিজ নেই। বরং বিনা পয়সায় ভর্তি করা হয় অনেক ছাত্রীদের। নারী শিক্ষার প্রসারে মহান পুরুষ বিদ্যাসাগরের জেলায় আমরা চলেছি তাঁর মহান ব্রতকে নিয়েই।”

শিক্ষিকাদের অনুষ্ঠান :

তবে, অনুষ্ঠান সাফল্যমন্ডিত হলেও, শহর ও জেলার অনেক শিক্ষাবিদ এবং অতিথিবর্গ এলেও, আক্ষেপ থাকছে প্রধান শিক্ষিকার কন্ঠে। তিনি বলেন, “এই অনুষ্ঠানে অনেককেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। জনপ্রতিনিধি সহ প্রসাশনিক কর্তা ও প্রসাশকদের। আমরা পারিনি লক্ষ লক্ষ টাকায় বহিরাগত নাম করা শিল্পীদের আনতে। কিন্তু, আমরা পেরেছি আমাদের ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করে, প্রশিক্ষিত করে সুন্দর একটা অনুষ্ঠানে উপহার দিতে। অনেক আমন্ত্রিত ব্যাক্তিবর্গ আমাদের উপেক্ষা করলেন হয়তো, তাই এলেন না! আমরা আমাদের লক্ষ নিয়ে, পড়ুয়াদের নিয়েই এগিয়ে চলবো।” তবে, অনুষ্ঠানে এসেছিলেন, মেদিনীপুর রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সম্পাদক অমর্ত্যানন্দজী মহারাজ, মন্ত্রী শ্রীকান্ত মাহাতো, পৌরপ্রধান সৌমেন খান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের প্রথম কৃষ্ণেন্দু বিষই, রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জয়শ্রী লাহা, জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক বরুণ মন্ডল, অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক পৌলমী সাউ ও প্রকাশ সরকার, অধ্যাপিকা ও জেলা পরিষদের সদস্যা অঞ্জনা মাহাতো, বিষ্ণুপুর রামানন্দ কলেজের অধ্যক্ষা ড.স্বপ্না ঘোড়ই, সাহিত্যিক বিনোদ মন্ডল, কবি তাপস মাইতি, চিকিৎসক ডাঃ সুহাস রঞ্জন মন্ডল প্রমুখ। মঙ্গলবার অনুষ্ঠানের শেষ দিনে উপস্থিত ছিলেন, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি তথা বিধায়ক উত্তরা সিং হাজরা, এমকেডিএ-এর চেয়ারম্যান ও বিধায়ক দীনেন রায়, সমাজসেবী প্রদ্যোত ঘোষ, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ কৃপাসিন্ধু গাঁতাইত, জেলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক চাপেশ্বর সর্দার, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রশাসক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, বাচিক শিল্পী কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়, ছড়াকার প্রদীপ দেব বর্মণ প্রমুখ। তিনদিনই বিদ্যালয়ের সভাপতি মৃণাল কান্তি চৌধুরী এবং বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরা এবং মেদিনীপুর শহরের অতিথি শিল্পীরা।

পাহাড়ীপুর বালিকা বিদ্যালয় :

News Desk

Recent Posts

Kharagpur: চেয়ারম্যান নির্বাচনের আগেই খড়্গপুর পুরসভায় পৌঁছল শো-কজ নোটিশ

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১০ অক্টোবর: চেয়ারম্যান নির্বাচনের আগেই খড়্গপুর পুরসভায় পৌঁছল রাজ্য…

3 days ago

Kharagpur: শ্রীনুর গ্যাংয়ের সদস্যের বাড়ির ‘লোডেড’ পিস্তল নাড়াচাড়া করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ কিশোর, গ্রেপ্তার ৩

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৯ অক্টোবর: দুষ্কৃতীদের গুলিতে নয়, বন্ধুর বাড়িতে রাখা লাইসেন্সবিহীন…

4 days ago

Kharagpur: পুজোর আগেই খড়্গপুরে শুট-আউট! গুলিবিদ্ধ নবম শ্রেণির ছাত্র, আতঙ্ক রেল-শহরে

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৭ অক্টোবর: পুজোর মুখে ফের গুলির শব্দে কেঁপে উঠল…

6 days ago

Medinipur: পশ্চিম মেদিনীপুরে গ্রেপ্তার মমতাপন্থী তৃণমূলের জেলা সভাপতি অজিত মাইতি

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২৫ সেপ্টেম্বর: শুক্রবার ভোরে খড়্গপুর গ্রামীণের মাদপুরের বাড়ি থেকে…

3 weeks ago

Pranati Nayak: এশিয়াডে প্রণতির পদক অধরাই, শেষ করলেন ষষ্ঠ স্থানে

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২৪ সেপ্টেম্বর: আশা জাগিয়েও এশিয়াডে পদক অধরাই থাকল ভারতীয়…

3 weeks ago

Midnapore: ‘এমন রক্তদান উৎসব প্রতিটি ব্লকে হোক’, জঙ্গলমহল উত্তরণ ঐক্যমঞ্চের আয়োজনে মুগ্ধ রাজেশ, বিমান, শঙ্কররা

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৬ সেপ্টেম্বর: ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিতে রক্তের জন্য হাহাকার। কোথাও আবার…

4 weeks ago